দৈনন্দিন আমাদের জীবনে বাস্তুশাস্ত্রের প্রভাব কতটা?আসুন জানা যাক জ্যোতিষ আচার্য অনিমেষ পাত্র মোঃ7001310672
বাস্তু শাস্ত্র ভারতের প্রাচীন বাস্তুবিজ্ঞান ও স্থাপত্য কলা
বাস্তু শাস্ত্রের মু
খ্য উদ্দেশ্য হল – পরিবেশ ও প্রকৃতির
সঙ্গে সামঞ্জস্য বজায় রেখে সুসংহত বাড়ি ঘর নির্মাণ ও
নগরায়ন এবং নাগরিক জীবনের সুস্থিতি। সেজন্য আগাম
পরিকল্পনা অনুসারে সঠিক বাস্তুভূমি নির্বাচন করে – বাড়ি,
ঘর, মন্দির, বাজার, দোকান, সভাঘর, শিল্পাগার এবং
জনস্বাস্থ্যের উপযোগী সড়ক, পরিবহন, জলাশয়, বনাঞ্চল,
ও নিকাশি ব্যবস্থার যথাযথ রুপায়ন। ভারতের বিভিন্ন
প্রান্তে ছড়িয়ে থাকা প্রাচীন সৌধ, সেতু ও মন্দিরগুলি
পর্যবেক্ষণ করলে বাস্তু শাস্ত্রের সত্যতা, বিজ্ঞানসম্মত
নির্মাণ শৈলী, বিন্যাস, উপাদান ও সু-পরিকল্পনা সহজেই
বোঝা যায়।
বাস্তব সম্মত বাড়ি করতে হলে কমপক্ষে ৪ থেকে ৬
কাঠা আয়তাকার বা চতুষ্কোণ জমি দরকার। যার চারদিক
পাঁচিল দিয়ে ঘেরা, মাঝখানে বাড়ি, বাড়ির চারদিকে খোলা
জায়গা এবং গাছপালা থাকবে। ক�োলকাতার গভর্নর
হাউজ (রাজভবন) ও ব্রিটিশ আমলে বাংলায় তৈরি হওয়া
সরকারি বাংলোগুলি বাস্তু সম্মত আদর্শ বাড়ির উদাহরণ।
বাংলায় তৈরি হওয়া এই ধরণের বাড়ি থেকেই ইংরাজি
Bungalow কথাটার উৎপত্তি হয়েছে।
আধুনিক নাগরিক সভ্যতার বিকাশের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে
জনসংখ্যা চার-পাঁচ গুণ বেড়ে গেছে, অথচ বাসযোগ্য
জমির পরিমাণ আগের মতোই রয়ে গেছে। অবস্থার চাপে
পড়ে কৃষ িজমি দখল হয়েছে, জলাশয় ও নিচুজমি ভরাট
হয়েছে, বন জঙ্গল কেটে তবুও জমির আকাল এবং দু-
এক কাঠা জমির দাম আকাশ ছোঁয়া। এর সঙ্গে নির্মাণ
খরচও বহু গুণ বেড়ে গেছে। ফলে বহুতল আবাসন ছাড়া
সাধারণ মানুষের গতি নেই। ধনী, অর্থবান ও মধ্যবিত্ত
বহুতল আবাসনে ফ্ল্যাট কিনতে বাধ্য হচ্ছেন। প্রমোটারদের
তৈরি করা বহুতল আবাসনগুলিতে বাণিজ্যিক স্বার্থপ্রাধান্য
পায়। তারা চেষ্টা করেন যতটা সম্ভব বাড়তি জায়গা বের
করা যায়। ফলত, প্রমোটারদের তৈরি করা বাড়ি বা ফ্ল্যাট
বাস্তু সম্মত হবে তা আশা করা আকাশকুসুম কল্পনা মাত্র।
বর্তমান অবস্থার কথা বিবেচনা করে বাস্ত সম্মত বাস্তু
বিধান অনুসরণ করাই শ্রেয় ও বুদ্ধিমানের কাজ।
তথাকথিত বাস্তু-শাস্ত্রীর পরামর্শ মেনে বাস্তু সংশোধন,
সংস্কার বা পু
নর্নির্মাণ যথেষ্ট নয় এবং অকারণ অর্থ ও
সময় অপচয় হবে। সাধারণ মানুষ যাতে সহজেই নিজের
মতো বাস্তুসম্মত বাড়ি তৈরি করতে পারেন তার হাল-
হদিশ জানাচ্ছি। এগুলো মেনে চললে বাস্তু নিয়ে অকারণ
উদ্বেগ, উৎকণ্ঠা ও দো-টানা কাটবেই কাটবে।
বাস্তু সম্মত বাড়ি তৈরির সহজ সূত্র
১) যাদের নিজস্ব জমি আছে বা জমি কেনার সামর্থ্য
আছে, তারা নিজেরাই পরিকল্পনা করে বাস্তু মতে বাড়ি
করুন।
২) যাদের জমি আছে অথচ অনেক ভাইবোন বা বহু
শরিক, তারা আপোষ মীমাংসার মাধ্যমে নিজেরাই যৌথ
বহুতল বাড়ি বানান। এর ফলে অর্থ, সময় ও ঝামেলা
কম হবে। স্বাধীন ভাবে বসবাস ও ছাদ ব্যবহার করতে
পারবেন।
৩) জমি কিনে বাড়ি করার আগে সতর্কহোন। সস্তায়
জমি পেয়ে উল্লসিত হবেন না। কেনার আগে জমির
চরিত্র জানুন। পরিত্যক্ত শ্মশান, মন্দির, কবর, ভাগার,
সমাধিস্থল, পশু খামার এবং বদ্ধ ভূমিতে কখনই বাড়ি
করবেন না।
৪) বড় ধরণের নির্মাণের ক্ষেত্রে (যেমন- বহুতল আবাসন,
হোটেল, লজ, হাসপাতাল নার্সিংহোম, সভাঘর ও প্রেক্ষাগৃহ,
আবাসিক বিদ্যালয়, কল কারখানা, বৃদ্ধাশ্রম, শপিং মল্
ইত্যাদি) বিশেষ করে লক্ষ্য রাখুন
ক) এলাকাটি ভূকম্পন প্রবণ এলাকা কিনা ।
খ) সঠিক মাল-মশলা ও প্রযুক্তি ব্যবহার করুন ।
গ) অভিজ্ঞ নির্মাণ সংস্থার পরামর্শ ও প্ল্যান অনুসারে
পরিকাঠামো তৈরি করুন
ঘ) সব ধরণের আপদ কালীন অবস্থা মোকাবিলার জন্য
সুরক্ষা ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা যথাযথ ভাবে রাখু
ন ।
৫) আপনার বাড়ি ছোট, বড় বা মাঝারি যাই হোক না
কেন, বাড়ির একটা সুন্দর নাম দিন। প্রবেশ পথে “নাম
ফলক” লাগান।
৬) প্রতিটি ঘরে পর্যাপ্ত সূর্যের আলোর প্রবেশ, খোলা
হাওয়ার চলাচল ও জল নিকাশির ব্যবস্থা রাখু
ন।
৭) ঘরগুলির ব্যবহারের ধরন অনুসারে বিভিন্ন ধরণের
উজ্জ্বল রঙ ব্যবহার করুন। সাদা, হলুদ, কমলা, সবুজ
ও আকাশী রঙ ব্যবহার করুন।
8) ফেং শ্যুই নামক আবর্জনায় ( যেমন-কচ্ছপ, ব্যাঙ,
ক্রিস্টাল, আয়না, বনসাই, ক্যাকটাস, মানি প্ল্যান্ট ইত্যাদি
) ঘরদোর ভরিয়ে তুলবেন না।
৯) ছাদে, বারান্দায় ও খোলা জায়গায় মাটির টবে ভেষজ
গাছ লাগান। যেমন- বাসক, তুলসী, পুদিনা, ঘৃতকুমারী,
কালমেঘ, হলুদ, মেথি ও থানকুনি ইত্যাদি ।
১০) ফাঁকা জমিতে ও খোলা জায়গায় ফুল গাছ লাগান।
যেমন- বেল, টগর, জুঁই, নয়ন তারা, রজনীগন্ধা, গাঁদা,
জবা, করবী ও কৃষ্ণকলি ইত্যাদি। নিত্য পুজোর ফুল
কিনতে হবে না।
১১) পড়ার ঘরে, বসার ঘরে, ঠাকুর ঘরে এবং অন্যান্য
জায়গায় মাঙ্গলিক চিহ্ন (ঔঁ, স্বস্তিক, ত্রিশূল), ধর্মীয় বাণী,
শ্লোক, প্রাকৃতিক দৃশ্য, প্রেরণা দায়ক কবিতা, উদ্ধৃতি ,
বাণী, ও দেব-দেবীর ছবি ব্যবহার করুন।
১২) সাধারণ ছোট-খাটো বাড়ি বা ফ্ল্যাটে পশু-পাখি,
জন্তু-জানোয়ার পু
ষবেন না।
১৩) কীট-পতঙ্গ, জীবাণু, ছত্রাক, শেওলা ইত্যাদির উপদ্রব
ধূপ-ধূনা, কর্পূর , ইউক্যালিপটাস তেল ও আগরবাতি
ব্যবহার করুন।
১৪) আপনার বাড়ি বা ফ্ল্যাট যেমনই হোক ঠাকুর ঘর বা
মন্দির যেন থাকে। একান্তই যদি জায়গার অভাব থাকে
তাহলে কাঠের বা পাথরের সিংহাসন বা মন্দির বানিয়ে
নিন।
১৫) সুন্দর বাড়ি করলেন, ঘটা করে গৃহপ্রবেশ করলেন
তবুও কিন্তু আপনার কাজ শেয হল না। প্রতি চার-পাঁচ
বছর অন্তর বাড়ি রঙ করা, মাঝে মধ্যে জলের পাইপ
লাইন মেরামত, ছাদ, পাঁচিল ও কার্নিশের আগাছা নির্মূল
করুন।
১৬) ইট-কাঠ-পাথরের তৈরি আপনার সাধের বাড়িটা
(House) যথার্থঘর সংসার (Home) হয়ে ওঠে প্রাণের
স্পন্দনে। অকারণ চিৎকার, অশান্তি ও অবহেলায় তাকে
কলুষিত হতে দেবেন না। বাড়িটাকে মন্দির ভাবুন এবং
ঐকান্তিক চেষ্টা, মমতা ও ভালবাসা দিয়ে তাকে ছায়া
সুনিবিড় শান্তির নীড় করে তুলুন। যেখানে দিনের শেষে
পরম নিশ্চিন্তে ঘুমের দেশে পাড়ি দিতে পারেন।
Comments
Post a Comment